সর্বশেষ

চাঁদার পুরোটাই যাচ্ছে চিহ্নিত এক পরিবহন নেতা ও তার সহযোগীদের পকেটে

মঙ্গলবার, ১৩ মার্চ ২০১৮ | ১০:২১ পূর্বাহ্ণ | 123 বার

চাঁদার পুরোটাই যাচ্ছে চিহ্নিত এক পরিবহন নেতা ও তার সহযোগীদের পকেটে

রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন রুটে পরিবহন কোম্পানির ব্যানারে প্রায় ১৫ হাজার বাস চলাচল করছে। এসব পরিবহন থেকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নামে প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি চাঁদা তোলা হচ্ছে।
প্রতি মাসেই কোটি কোটি টাকার চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। যার পুরোটাই যাচ্ছে চিহ্নিত এক পরিবহন নেতা ও তার সহযোগীদের পকেটে। পরিবহন মালিক সমিতির আওয়ামীপন্থি ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে বিএনপি জামায়াত হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের নিয়ে ওই নেতা গড়ে তুলেছেন এক সিন্ডিকেট। জানা গেছে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আয়ত্বে থাকায় আওয়ামী লীগ সমর্থক ত্যাগী পরিবহন নেতারা এখন কোণঠাসা অবস্থায়। আর এজন্য তাদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। ফলে পরিবহন সেক্টরে যেকোনো সময় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে অনেকেই জানিয়েছেন। ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬ হাজার বাস চলাচল করে। এরমধ্যে মহাখালী থেকে ২৬শ, ফুলবাড়িয়া থেকে ১৭শ-১৮শ, সায়েদাবাদ থেকে সাড়ে তিন হাজার, গুলিস্তান থেকে ১২শ-১৩শ, মিরপুর থেকে ৮শ, মতিঝিল কমলাপুর থেকে প্রায় ৬শ, আজিমপুর থেকে ৬শ, গাবতলী থেকে ৩ হাজার ৬শ ও অন্যান্য স্থান বা ভাসমান আছে আরো ১৫শ বাস। এসব বাস থেকে প্রতিদিন ৫শ-১১শ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়।
তাছাড়া, ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন যানবাহন শ্রমিক সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া থেকে রাজধানী ঢাকা ও শহরতলীর ৩৪টি পরিবহন থেকে দৈনিক প্রায় ১৪ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে পরিবহন সমিতি। এরমধ্যে বাস প্রতি ৩০ টাকা হারে মাত্র ৫১ হাজার টাকা শ্রমিক ইউনিয়ন ও ৫ টাকা হারে বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন পায়। আর বাকি টাকার পুরোটাই ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন নেতাদের পকেটে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরিবহন ব্যবসায়ী জানান, নব্য আওয়ামী লীগ হিসেবে পরিচিত একজন প্রভাবশালী নেতা তার ও সহযোগীরা এই চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ করছে। যার নেতৃত্বে রয়েছেন খন্দকার এনায়েত উল্লাহ ও তার সহযোগীরা। এসব সহযোগীদের অধিকাংশই বিএনপি জামায়াতের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। এরমধ্যে ফুলবাড়িয়া টার্মিনালে চাঁদা তোলার দায়িত্বপ্রাপ্ত হুমায়ুন কবির তপন ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচিত। একইভাবে প্রভাতী বনশ্রী পরিবহনের সভাপতি শহীদুল্লাহ শাহীনও বিএনপির সমর্থক। এছাড়া তানজিল পরিবহনের সভাপতি মো. খোকন, এয়ারপোর্ট রুটের সভাপতি মো. হাবীব, শুভযাত্রা পরিবহনের সভাপতি মো. ফয়সাল, সায়েদাবাদ টার্মিনালের সভাপতি আবুল কালাম, ডিলিংক এর সাধারণ সম্পাদক মো. রতন, আজমেরী পরিবহনের সাধারণ সম্পাদক হেলাল, আরাম পরিবহনের নির্বাহী পরিচালক মো. আলমগীর, মহাখালী বাস টার্মিনালের সাদেকুর রহমান হিরু, গাবতলী টার্মিনালের সাধারণ সম্পাদক আতিক, আজিমপুর বাস-স্ট্যান্ডের (২৭ ভিআইপি রুট) সাধারণ সম্পাদক মো. রাজ্জাক, স্কাইলাইনের সাধারণ সম্পাদক মো. নান্নু, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. টিপু, ডিলিংকের পরিচালক মো. ওয়ালিদ ও ওয়াহিদ, প্রভাতী বনশ্রীর পরিচালক সাজু, গোলাপ, আফসার, ফারুক, গাবতলীর সাত্তার, ২৭ ভিআইপির কামাল ওরফে এতিম কামাল, মনির ওরফে এতিম মনির, যাত্রীসেবার সাধারণ সম্পাদক বাবুল, স্বাধীন পরিবহনের সভাপতি মো. মামুন, সাধারণ সম্পাদক মন্টু, স্কাইলাইনের মনছুর, সুপ্রভাতের সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফ, ঢাকা বেতকা রুটের সভাপতি রনি ভা-ারি, সাধারণ সম্পাদক সানা উল্লাহ এবং ভিক্টর পরিবহনের সাধারণ সম্পাদক মো. মানিক বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচিত। উল্লিখিত ব্যক্তিরা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহর ঘনিষ্ঠ। তার ছত্রচ্ছায়ায় থেকে এসব ব্যক্তি বিভিন্ন রুটে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ করছেন। ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কাশেম, সাধারণ সম্পাদক হাজী ইসমাইল হোসেন বাচ্চুর নেতৃত্বে ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন সমিতির ২১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এনায়েত উল্লাহ গ্রুপের কারণে এ কার্যনির্বাহী কমিটি বর্তমানে কোণঠাসা। তারা কোনো কার্যক্রমই পরিচালনা করতে পারছে না।
ভুক্তভোগী পরিবহন নেতারা জানান, খন্দকার এনায়েত উল্লাহ এক সময় বিএনপি করতেন। তিনি বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে ওই সময় থেকেই পরিবহন সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করতেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তার ক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে। তিনি কয়েকজন মন্ত্রীকে ম্যানেজ করে এখন পুরো পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন। তিনি প্রত্যেকটি রুটে বাস প্রতি দৈনিক হারে ও ট্রিপ হারে চাঁদা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তার নির্ধারিত চাঁদা না দিলে কোনো গাড়ির চাকা রাস্তায় ঘোরে না।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে ৩৪টি পরিবহনের প্রতিটি গাড়ি থেকে প্রতিদিন ৩শ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। যার পরিমাণ দৈনিক ১৩ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫০ টাকা। এরমধ্যে প্রভাতী বনশ্রী ১২০টি গাড়ি থেকে দৈনিক এক হাজার টাকা করে এক লাখ ২০ হাজার টাকা, ডি-লিংকের ১৪০টি গাড়ি থেকে ৮শ টাকা করে প্রতিদিন এক লাখ ১২ হাজার টাকা, গ্রামীণ সেবার ৪৫টি গাড়ি থেকে ৯শ টাকা করে ৪০ হাজার ৫শ টাকা, শুভযাত্রা পরিবহনের ৫০টি গাড়ি থেকে এক হাজার টাকা করে ৫০ হাজার টাকা, আজমেরি পরিবহনের ১৩০টি গাড়ি থেকে এক হাজার টাকা করে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা, গাজীপুর পরিবহনের ৫০টি গাড়ি থেকে ৮শ টাকা করে ৪০ হাজার টাকা, ঢাকা পরিবহনের ৪০টি গাড়ি থেকে ৭শ টাকা করে ২৮ হাজার টাকা, স্কাইলাইন পরিবহনের ৩৫টি গাড়ি থেকে ৮৫০ টাকা করে ২৯ হাজার ৭৫০ টাকা, এয়ারপোর্ট পরিবহনের ১১০টি বাস থেকে এক হাজার টাকা করে এক লাখ ১০ হাজার টাকা, দিশারী ও তানজীল পরিবহনের ৭০টি গাড়ি থেকে ৬শ টাকা করে ৪২ হাজার টাকা, ইটিসি ও ইউনাইটেড পরিবহনের ৬০টি গাড়ি থেকে ৭শ টাকা করে ৪২ হাজার টাকা, সময় নিয়ন্ত্রণের ১৫টি গাড়ি থেকে ৭শ টাকা করে ১০ হাজার ৫শ টাকা, বিহঙ্গ পরিবহনের ৮০টি গাড়ি থেকে ৫শ টাকা করে ৪০ হাজার টাকা, সুপ্রভাত পরিবহানের ১৪০টি বাস থেকে এক হাজার টাকা করে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। আর ভিক্টর পরিবহনের ২০টি গাড়ি থেকে এক হাজার টাকা করে ২০ হাজার টাকা, সাভার পরিবহানের ৩৫টি গাড়ি থেকে ৮শ টাকা করে ২৮ হাজার টাকা, স্বাধীন পরিবহনের ৬৫টি গাড়ি থেকে এক হাজার টাকা করে ৬৫ হাজার টাকা, প্রচেষ্টা পরিবহনের ৪০টি গাড়ি থেকে ৬শ টাকা করে ২৪ হাজার টাকা, আরাম পরিবহনের ৪০ গাড়ি থেকে ৬শ টাকা করে ২৪ হাজার টাকা, যুবদোহার পরিবহনের ১৫ বাস থেকে এক হাজার টাকা করে ১৫ হাজার টাকা আদায় হচ্ছে। ডিএনকে পরিবহনের ২০ বাস থেকে এক হাজার টাকা করে ২০ হাজার টাকা, এম মল্লিক পরিবহনের ৩০ গাড়ি থেকে ৪৩০ টাকা করে ১২ হাজার ৯শ টাকা, যমুনা পরিবহনের ৪০ বাস থেকে এক হাজার টাকা করে ৪০ হাজার টাকা, নগর পরিবহনের ৪০ বাস থেকে এক হাজার টাকা করে ৪০ হাজার টাকা, ডিএম পরিবহনের ৪০ বাস থেকে ৮শ টাকা করে ৩২ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে।
এছাড়া এসএস পরিবহনের ৪০ বাস থেকে ৮শ টাকা করে ৩২ হাজার টাকা, বৈশাখী পরিবহনের ২০ বাস থেকে ৮শ টাকা করে ১৬ হাজার টাকা, দীঘিরপাড় ট্রান্সপোর্টের ৪০ বাস থেকে ৮শ টাকা করে ৩২ হাজার টাকা, টুঙ্গীপাড়া এক্সপ্রেসের ২০ বাস থেকে ৩শ টাকা করে ৬ হাজার টাকা, এমাদ পরিবহনের ১০ বাস থেকে ৩শ টাকা করে ৩ হাজার টাকা, দোলা পরিবহনের ১০ বাস থেকে ৩শ টাকা করে ৩ হাজার টাকা, বিআরটিসির ৬০ বাস থেকে ২শ টাকা করে ১২ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।
এর মধ্যে বাসপতি মালিক সমিতির নামে ৩শ থেকে ৭শ টাকা, ঢাকা সড়কের নামে ৪০ টাকা, ইফতারের নামে ২০ টাকা, অফিস ক্রয়ের নামে ২০ টাকা, কমিউনিটি পুলিশের নামে ২০ টাকা, সিটি টোল খাতে ২০ টাকা, ব্রিজ টোল ৩০ টাকা, কমন বা বোবা ফান্ডের নামে ১শ থেকে ২শ টাকা ও সুপারভাইজারের নামে ৬০ টাকা করে চাঁদা তোলা হচ্ছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিবহন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
আরেক সূত্র জানায়, গুলিস্তান ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে প্রতিটি বাস নামানোর সময় এককালীন ২০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এরমধ্যে প্রভাতী বনশ্রী, ডিলিংক, আজমেরি, এয়ারপোর্ট পরিবহন ও সুপ্রভাত পরিবহনে নতুন বাস নামাতে গেলে গাড়ি প্রতি ২ লাখ টাকা, গ্রামীণ সেবা, শুভযাত্রা, গাজীপুর পরিবহন, ঢাকা পরিবহন, স্বাধীন পরিবহন, এম মল্লিক, যমুনা, নগর পরিবহন ও দীঘিরপাড় পরিবহনে গাড়িপ্রতি এক লাখ টাকা, স্কাইলাইন, দিশারী, তানজীল, ইটিসি, ইউনাইটেড, সাভার পরিবহন, ডিএম পরিবহন ও এসএস পরিবহনে দিতে হয় ৫০ হাজার টাকা, বৈশাখী, ডিএনকে, যুবদোহার, ভিক্টর ও সময় নিয়ন্ত্রণ পরিবহনে ২০ হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে। আবার প্রতিবছর এসব গাড়ি নবায়ন করতে হয়।
ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন যানবাহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সরেজমিন খোঁজ নিয়ে যা বলছেন, তার বিষয়ে আমি আর কিছু বলবো না। আমাকে জনৈক শহীদুল্লাহ শাহীন নামে এক ছেলেকে নেতা বানিয়ে আমাকে পরিবহন থেকে বিতাড়নের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে রাজধানীর বংশালসহ বিভিন্ন থানায় বাস চালক ও হেলপারদের দিয়ে একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হচ্ছে। পরিবহন সেক্টর এক ব্যক্তির কাছেই জিম্মি বলে জানান তিনি।

Share this...
Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn

মন্তব্য

comments

সরকারী কর্মচারী আয়কর অব্যাহতি এর গেজেট

২০১৭ | এই ওয়েবসাইটের কোনো সংবাদ বা ছবি অন্য কোথাও প্রকাশ করবেন না

Development by: Rumi